শান্তিগঞ্জ সংবাদদাতা
বর্ষার আগমনে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরপাড়ের জনপদ। দেখার হাওরকেন্দ্রিক হাজারো পরিবার এখনও মাছ ধরার পেশার ওপর নির্ভরশীল। শান্তিগঞ্জে জেলেদের সবচেয়ে বড় ভরসা এই হাওরটি। এখানকার বেশিরভাগ জেলের জীবিকা চলে দেখার হাওরের মাছ ধরে। তবে সাংহাই হাওরসহ অন্যান্য হাওর-বিল-ঝিলে এখন তেমন মাছ পাওয়া যায় না। ফলে দিন দিন এ পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনের জলছন্দে চলতে গিয়ে তাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও কষ্টের গল্প এখানকার নদী-হাওরের মতোই গভীর।
জুন-জুলাই থেকে শুরু হয় মাছের মৌসুম। হাওরের পানি বাড়তে শুরু করায় জেলেরা নৌকা সারাই ও জাল তৈরি সহ নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ বাঁধ, পানিদূষণ ও হাওরের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের উৎপাদন আগের মতো নেই। ফলে মাছ ধরা এখন আর নিশ্চিন্ত আয়ের পথ নয়।
দেখার হাওরে মাছ ধরেন পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের সুনু মিয়া, আব্দুর রউফ ও ইনাতনগর গ্রামের আইনুল হক। তারা বলেন, আমরা ঋণ নিয়ে জাল ও নৌকা ঠিক করি। কয়েক বছর আগে ইউনিয়ন অফিসে আমাদের জাল জমা রেখে কিছু ভাতা পেয়েছিলাম। যদি সরকার নিষিদ্ধ সময়ে কিছু সহযোগিতা করে, তাহলে মা মাছ ধরার প্রয়োজন হতো না।
তারা আরও বলেন, বর্ষার বাইরে কোনো কাজ পাই না। সরকার যদি বিকল্প আয়ের সুযোগ দেয়, তাহলে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে বাঁচতে পারব। আগে বর্ষায় অনেক মাছ পেতাম। এখন সারাদিন কষ্ট করে যা পাই, তাতে সংসার চলে না। পোনা মাছ ছাড়া হলে আশার আলো দেখছি, তবে বড় মাছ পেতে আরও সময় লাগবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৯ হাজার কার্ডধারী জেলে রয়েছেন; সব মিলিয়ে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। মাছের উৎপাদন বাড়াতে জুলাই-আগস্টে দেখারসহ অন্যান্য হাওরে পোনা মাছ অবমুক্ত করার কার্যক্রম শুরু হবে।
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিদ্যুৎ চন্দ্র সরকার বলেন, দেখারসহ অন্যান্য ছোট হাওরে পোনা অবমুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন বাড়ানো হবে। আগস্টের মধ্যে এসব পোনা ছাড়া সম্পন্ন হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা হাওর-বিল এলাকায় নার্সারি করি, পোনা অবমুক্ত করি এবং মাছ নিধনে অবৈধ রিং ঝাল, চায়না ঝাল, কারেন্ট জাল ও অবৈধ বাঁধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করি। প্রচার, মাইকিং এবং সচেতনতা সভাও করা হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত মা মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়। আগামী বছর থেকে এ সময়ে জেলেদের জন্য বিশেষ ভিজিডি চাল ও রেশন প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। যেন তারা বিকল্প আয়ে ভর করে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ না ধরে।
জেলেরা মনে করেন, শুধু পোনা মাছ অবমুক্ত করলেই চলবে না, হাওরে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, পরিবেশ রক্ষা এবং মৌসুম শেষে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। না হলে বর্ষা শেষে তারা প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়েন।##