সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের দিরাইয়ে প্রায় এক মাস ধরে দ্বিধাবিভক্ত উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন ও যৌথসভাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবারের সমাবেশে দুর্নীতি ও দলীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে দিরাই থানা পয়েন্টে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত জুলাই স্মরণ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন জীবিত আছি, কাউকে কোনো ধরনের দুর্নীতি করার সুযোগ দেব না। যারা দলের নাম ব্যবহার করে চুরি-দুর্নীতি করতে পারছে না, তারাই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আজকের এই সমাবেশই বিএনপির মূল সমাবেশ। এর বাইরে বিএনপির নামে আর কোনো সমাবেশ নেই। আগামী ৮ আগস্ট বিএনপির নামে যারা আলাদা সমাবেশ করার চেষ্টা করছে, তারা মূলত দলে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চায়। তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
নিজের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ভাই নেই, আমি একা। এমনকি আমার বাসাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এরপরও একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা বলে আমি লাখ লাখ টাকা লুটপাট করছি। যারা এসব অভিযোগ করে, তাদের জিজ্ঞাসা করুন—আসলে কত টাকা বরাদ্দ এসেছে। প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য জেনে নিন।’
দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দুর্নীতি করার সুযোগ দেব না।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক সরদারের সঞ্চালনায় সমাবেশে উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন।
এ সময় বক্তব্য দেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলম, পৌর কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান, পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল আহমদ, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সজীব রশীদ চৌধুরী, উপজেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা রজব আলী, উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক সালাহ উদ্দিন তালুকদার, পৌর বিএনপির সদস্য কায়সার ইসলাম ও সোহেল মিয়া, কুলঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বাবুল মিয়া, তাড়ল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীন ইসলাম, করিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রহিম, সরমঙ্গল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির মিয়া, চরনারচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল জলিল ও সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান এবং ভাটিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ দীপ আলীসহ আরও অনেকে।
দিরাই-শাল্লার বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ভাটি অঞ্চলের এই প্রবীণ রাজনীতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে অসুস্থ হয়ে পড়লেও নির্বাচনী এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে দল তাঁকেই মনোনয়ন দেয়।
নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অসুস্থতার পর স্থানীয় বিএনপিতে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয় বলে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। বর্তমানে এই বিরোধ দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎ ভাই ও উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। অপর পক্ষের নেতাকর্মীরা সংসদ সদস্যের স্ত্রী পারভিন আক্তারের পরামর্শে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির স্থানীয় একাধিক নেতাকর্মীর ভাষ্য, এমপির রাজনৈতিক ছায়া ও নেতৃত্বের প্রভাব কার মাধ্যমে পরিচালিত হবে—এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মূল বিরোধ তৈরি হয়েছে।
গত প্রায় এক মাসে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, যৌথসভা, নেতাকর্মীদের অব্যাহতির সুপারিশ এবং পৃথক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৮ আগস্ট একই ইস্যুতে অপর পক্ষ পৃথক সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
ফলে সংসদ সদস্যের কঠোর বক্তব্যের পরও দিরাই উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কতটা নিরসন হবে, তা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
মন্তব্য করুন