শান্তিগঞ্জ সংবাদদাতা:
উন্নত জীবনের আশায় অবৈধপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবকেরও কোনো সন্ধান মিলছে না। এ ঘটনায় নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারে নেমে এসেছে উৎকণ্ঠা ও শোকের ছায়া।
এর আগে পাঁচজনের নিখোঁজের খবর পাওয়া গেলেও নতুন করে আরও একজনের সন্ধান না পাওয়ায় শান্তিগঞ্জের নিখোঁজ যুবকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। নিখোঁজ স্বজনরা কোথায়, কী অবস্থায় আছেন কিংবা তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে দালালচক্রের ভয়ে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করছেন অনেকেই।
নিখোঁজ যুবকরা হলেন পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া ও মামুন খাঁন, রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং দরগাপাশা ইউনিয়নের সিচনী গ্রামের সাগর পাল।
নিখোঁজ হৃদয় পালের বাবা রন্টু পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ মুঠোফোনে ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়। ওই সময় হৃদয় জানিয়েছিল, এক-দুই দিনের মধ্যেই লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হবে সে। এরপর থেকে আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রন্টু পাল বলেন, লিবিয়ায় অবস্থানরত উমর আলী এবং শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের কদ্দুস আলীর সঙ্গে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে হৃদয়কে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারতে পাঠানো হয়। পরে ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা, সেখান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে তাকে লিবিয়া পাঠানো হয়। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় হৃদয়।
তিনি আরও জানান, ছেলের বিষয়ে খোঁজ নিতে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল তার বাড়ি পরিদর্শন করেছে।
অপর নিখোঁজ যুবক মামুনের চাচা বলেন, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয় মামুন। রওনা হওয়ার দিন পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তার। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই।
এদিকে, একই নৌকায় থাকা শান্তিগঞ্জের আরও চার যুবক জীবিত উদ্ধার হয়ে মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা হলেন দরগাপাশা ইউনিয়নের সিচনী গ্রামের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, একই ইউনিয়নের বুরুমপুর গ্রামের আলিম উদ্দিন এবং পাথারিয়া ইউনিয়নের আবু সাইদ ও আব্দুল করিম। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে উন্নতির দিকে। তবে চিকিৎসাধীন স্বজনদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দালালদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন তারা।
মিশরে চিকিৎসাধীন পাথারিয়া ইউনিয়নের আব্দুল করিম এক ভিডিও বার্তায় ওই নৌযাত্রার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশ্যে লিবিয়া থেকে রওনা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছার পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধারে দালালদের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল করিম আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনে নয়জন বাংলাদেশি মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
তিনি জানান, তারা বর্তমানে মিশরের মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সেখানকার চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। ভিডিও বার্তায় তিনি দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আকুতি জানান।
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলিউল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কোনো পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমরা নিজ উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি।