স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান শস্যবিন্যাসে এসব জাত অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা চিহ্নিত করে গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ এবং কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় শান্তিগঞ্জের এফআইভিডিবি অডিটরিয়ামে বিনা উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহের সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্তিকরণে করণীয়’ শীর্ষক আঞ্চলিক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনার গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের অর্থায়নে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের উপযোগী কয়েকটি বিনা উদ্ভাবিত জাতের কথাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে বিনা ধান-২৪, বিনা ধান-২৫, বিনা ধান-১৯, বিনা সরিষা-১১, বিনা চিনাবাদাম-৪ ও বিনা চিনাবাদাম-৮ উল্লেখ করা হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিনা, ময়মনসিংহের পরিচালক (গবেষণা) ড. মাহবুবা কানিজ হাসনা। সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খাদিমনগর, সিলেটের প্রিন্সিপাল সুব্রত কুমার চক্রবর্তী, আঞ্চলিক বীজ প্রত্যয়ন অফিসার শামছুদ্দিন আহমদ, বিনার গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহবুবুল আলম তরফদার এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আশিকুর রহমান।
কর্মশালায় সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, বিএডিসির যুগ্মপরিচালক (বীজ বিপণন) মো. হুমায়ুন কবীর, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা, কৃষক, উদ্যোক্তা কৃষক, বীজ ডিলার এবং বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় বিনার গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহবুবুল আলম তরফদার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ দেবল সরকার এবং সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ এ.এ. মাছুম বিল্লাহ পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বক্তারা বলেন, এ অঞ্চলের কৃষির অন্যতম বড় সমস্যা পানি। এর পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি, বীজ ও অন্যান্য উপকরণের সমস্যাও রয়েছে। জমির মালিকানা ও বর্গাচাষের বিষয়টিও কৃষি পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত জমির মালিকরা জমিতে না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই ছাতার নিচে সবাইকে নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে এ অঞ্চলের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
কৃষকদের সহায়তায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন বক্তারা। তারা খাল খনন, কৃষক কার্ড প্রণয়ন, কৃষিতে ভর্তুকি, বৃক্ষরোপণ এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসারের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর মতো কার্যক্রম কৃষক পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
কর্মশালায় বিনার উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ১৩৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাত মিউটেশন পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত। মিউটেশনভিত্তিক জাত উন্নয়নে বিনা বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বলেও কর্মশালায় উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা বলেন, কোনো ফসলের জাত উন্নয়নে প্রচলিত গবেষণা পদ্ধতিতে সমস্যা তৈরি হলে সেখানে বিনার নিউক্লিয়ার টেকনিক কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্রোমোজোমে পরিবর্তন ঘটিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য জাত উন্নয়নের কাজ করে বিনা।
তারা বলেন, অন্যান্য অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বিনার কাজের পরিধি বিস্তৃত। ধান, পাট বা গমের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফসল নিয়েও বিনা গবেষণা করছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষির প্রয়োজন অনুযায়ী জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিনার ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
বক্তারা জানান, এসব জাতের কয়েকটি এ অঞ্চলে ইতোমধ্যে চাষাবাদ হচ্ছে। তবে বিদ্যমান শস্যবিন্যাসে এসব জাতকে কীভাবে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের উপযোগী বিনার জাতগুলোকে আরও ব্যাপকভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শস্যবিন্যাসে সেগুলোর ব্যবহার বাড়ানো।
উন্মুক্ত আলোচনায় কৃষক, উদ্যোক্তা কৃষক, বীজ ডিলার, কর্মকর্তা ও অন্যান্য অংশীজনরা তাদের বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় এ অঞ্চলের কৃষির সমস্যা, সম্ভাবনা এবং বিনার উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নিয়ে মতামত দেওয়া হয়।
বক্তারা অংশগ্রহণকারীদের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভালো উদ্যোগ ও কার্যকর প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তারা বলেন, কৃষির উন্নয়নে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, কৃষক এবং অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিনার উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।