স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে শিক্ষার হারে অনেক পিছিয়ে আছে।
হাওর অধ্যুষিত এই এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা ধান বা বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করে। ফসল তোলার মৌসুমে পরিবারের সকলে মিলে জমিতে কাজ করে। যে কারণে আমরা দেখি, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা একটা লম্বা সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এতে ফলাফলের দিক দিয়েও তারা পিছিয়ে পড়ে। একসময় তাদের বড় অংশ স্কুল থেকে ঝরে যায়। বাকিরা পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও তাদের মৌলিক শিক্ষায় বড় ঘাটতি দেখা দেয়-এমনটা বলছিলেন সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা। সম্প্রতি এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি, যার মাধ্যমে হইচই পড়ে গেছে শান্তিগঞ্জের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে।
সুকান্ত সাহার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল বিস্তারিত। তিনি বলেন, 'আমি দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে প্রায়ই বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করি। প্রায়ই দেখেছি, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী খুব সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয়ের তথ্যও তারা জানে না। যেমন সুনামগঞ্জে কয়টি হাওর-এটি বইয়ে না থাকলেও শিক্ষার্থীদের জানার কথা। কিন্তু তারা জানে না। বাংলায় নিজের সম্পর্কে পাঁচটি বাক্য বলতে বললেও অনেকে পারছে না। দুটি সংখ্যার যোগ-বিয়োগেও ভুল হচ্ছে। ইংরেজি ও গণিতের প্রতি ভীতির কারণে ফলাফল খারাপ হচ্ছে। জড়তার কারণে কেউ কেউ জানা উত্তরও ভুল করে। এসব বিষয় দেখে আমার মনে হয়েছে, এখানকার প্রাথমিক শিক্ষায় একটা বড় নাড়া দেওয়া দরকার।'
এরপরই সুকান্তের নেতৃত্বে এক বড় কর্মযজ্ঞের প্রস্তুতি নেয় শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। প্রণয়ন করা হয় একটি কৌশলভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি। বিভিন্ন 'বেসিক' বিষয়ের আলোকে একটি সিলেবাস তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য সবকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের প্রস্তুতি শেষে গ্রহণ করা হয় 'বেসিক নলেজ টেস্ট', যেখান অংশ নেয় শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৯৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী। ৯০ মার্কের প্রশ্ন করা হয় বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর। বাকি ১০ মার্ক ছিল দ্রুতপঠনের ওপর। প্রশ্নের ধরনও ছিল গতানুগতিক পরীক্ষার চেয়ে ভিন্ন।
স্কুলে যারা অনুপস্থিত ছিল, শিক্ষকরাও তাদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছেন। কারণ, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা ছিল, স্কুলগুলোর গড় ফলাফল নির্ধারণের সময় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর স্থানে শূন্য বসানো হবে। ফলে এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে প্রায় নব্বইভাগ শিক্ষার্থী। শিক্ষকরাও বাড়তি শ্রম দিয়ে তাদের অনুশীলন করিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, ৯৭-এর মাঝে ৮২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোটামুটি নম্বর পেয়ে পাস করলেও বাকি ১৫টি বিদ্যালয়ের ফল একেবারেই তলানিতে। এছাড়া গড় নম্বরের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়কে 'সেরা' হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আশি থেকে নব্বইয়ের বেশি নম্বর পাওয়া প্রায় সাড়ে তিন শ' শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয়েছে পুরস্কৃত করার জন্য। পরোক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে শিক্ষকদেরও। যে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে, সেই বিষয়ের শিক্ষকদেরও সম্মান জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদেরও ডাকা হয়েছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার জন্য।
সকান্ত সাহা জানান, ফলাফলের টেবুলেশন তৈরি করা হয়েছে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাইনামিক পদ্ধতিতে। এতে পুরো নলেজ টেস্টের ফল থেকে বিভিন্ন উপাত্ত সাজানো যাচ্ছে। স্কুলভিত্তিক গড়, বিষয়ভিত্তিক গড়, ক্লাস্টারভিত্তিক গড়সহ নানা উপায়ে গ্রাফ তৈরি করা হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এই ফলে পরিবর্তন আসছে কিনা বা শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন ঘটছে কিনা, সেটিও গ্রাফ পর্যালোচনা করে আগামীতে যাচাই করা যাবে। বছরে দুইবার এ ধরনের বেসিক নলেজ টেস্ট আয়োজনের কথা ভাবছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। এই উদ্যোগটি সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্যই অনুকরণীয় হতে পারে, এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এব্যাপারে ইউএনও সুকান্ত সাহা বলেন, 'শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়াশোনাকে একটা আনন্দের বিষয়ে পরিণত করতেই আমরা এমন উদ্যোগ নিয়েছি। বর্ষাকালে সাধারণত যে বিদ্যালয়ের উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসে, সেখানে উপস্থিতি ৮৫ শতাংশের বেশি ছিল। এটি আমাদের মাঝেও আশা জাগিয়েছে। আমরা চাই, পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেরও প্রসার ঘটাতে।'